জনকল্যাণের অদম্য ইচ্ছা প্রতিবন্ধী তামান্না নূরা’র

জনকল্যাণের অদম্য ইচ্ছা প্রতিবন্ধী তামান্না নূরা’র

জানুয়ারি ১০, ২০১৮ : ৯:৫৩ অপরাহ্ণ || দৈনিক বাস্তবতা

print
যশোর প্রতিনিধি :

অদম্য মেধাবী, দৃষ্টিনন্দন, স্পষ্ট লেখনী, পেশাদার চিত্রশিল্পীদের হার মানাবে তার অঙ্কনে। চেহারাও আর ১০ জনের চেয়ে বিধাতা দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন অনেকখানি সুন্দরী করে। এসবের অধিকারী যে, তার নাম তামান্না নূরা। কিন্তু বিধিবাম এই তামান্না নূরা জন্ম প্রতিবন্ধী। তামান্না নূরার জন্ম ২০০৩ সালের ডিসেম্বর মাসে যশোর জেলার ঝিকরগাছা উপজেলার পানিসারা গ্রামে। বাবা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী রওশন আলী। মা খাদিজা পারভীন শিল্পী। তিন ভাইবোনের মধ্যে তামান্না নূরা বড়। জন্ম প্রতিবন্ধী তামান্না নূরা’র দুটি হাত ও একটি পা নেই। শুধু বাম পাটি নিয়ে জন্ম নেয়া তামান্না। জীবনে কখনো দুই পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়াতে পারেনি। দুই হাত দিয়ে স্পর্শ করতে পারেনি মমতাময়ী মায়ের আঁচল। তারপরেও তার ইচ্ছা অন্যের বোঝা নয়, লেখাপড়া শিখে স্বাবলম্বী হয়ে বাঁচা। দুই বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় তামান্না। ছোট বোন মমতাহেনা রশ্মী প্রথম শ্রেণিতে পড়ে। ভাই মহিবুল্লার বয়স দুই বছর। তামান্না জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছেন। এর আগে প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষাতেও জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন তামান্না। এখন সে দশম শ্রেণিতে পড়াশুনো করছে। চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে সে বেছে নিয়েছে বিজ্ঞান বিভাগ। পা দিয়ে লেখার পাশাপাশি সুন্দর ছবি আকাঁর জন্য প্রশংসিত হচ্ছে এই কিশোরী। চ্যালেঞ্জিং জীবনের গল্প শোনান তামান্না। তিনি জানান, প্রথম প্রথম যখন আমি লিখতাম তখন আমার পায়ের আঙুলের ফাঁকে ব্যথা হতো। আস্তে আস্তে অভ্যাস হয়ে যায়। এখন এটা আমার কাছে কিছুই মনে হয়না। তিনি বলেন, আমার স্কুলে যেতে খুবই ভালো লাগে। যে দিন আমি স্কুলে না যাই, সেদিন আমার খুব খারাপ লাগে।

তামান্না বলেন, পড়াশুনার পাশাপাশি ছবি আঁকতে খুবই ভালো লাগে। গাছপালা, পশু পাখি, মানুষের ছবি আঁকতে ভালো লাগে। তামান্না বড় হয়ে মানুষের সেবা করতে চান। এজন্য তিনি বিজ্ঞান বিভাগ নিয়ে পড়াশুনা করছে। তার এই স্বপ্ন পূরণে সমাজের সব শ্রেণি পেশার মানুষের কাছে সহযোগিতা চান তামান্না। তামান্নার এ পর্যায়ে উঠে আসা কতটা চ্যালেঞ্জিং ছিলো তা জানান তার বাবা রওশন আলী।
তিনি বলেন, আমি শিক্ষিত হয়েও কোন চাকরি করিনি আমার মেয়ের জন্য। ছোট্ট মেয়েটাকে নিয়ে আমার মনে চ্যালেঞ্জ ফুটে উঠলো যে ওকে অনেক উপরে নিয়ে যেতে হবে। প্রথম যখন ওর পায়ের আঙুলের ফাকে চক দিই, ও (তামান্না) বলছিল, আব্বু একটু যেন ব্যথা করে। এরপর আমি কলমের মত বলে পাটখড়ি দিতাম পায়ের আঙুলের ফাঁকে। একটা সময় যখন সেটা ওর অভ্যাস হলো, তখন আস্তে আস্তে কলম দিতে শুরু করলাম। কিছুদিন পর সে বর্ণমালা লেখা শিখে ফেললো। কিন্তু স্কুলে ভর্তি করাতে নিয়ে যাবার পর সবাই বললো, একে আনছেন কেনো, এ কি পারবে নাকি ? এরকম কথা আমাকে ভীষণ আহত করেছিলো। আমার মনে হয়েছিলো, এই মেয়েকে নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।

জনকল্যাণের অদম্য ইচ্ছা প্রতিবন্ধী তামান্না নূরা’র

স্কুলে ভর্তি হবার পর তামান্না প্রথম শ্রেণি থেকে দ্বিতীয় শ্রেণিতে ওঠে ফার্স্ট হয়ে। সেটা যেন ওর উৎসাহ আরো বাড়িয়ে দেয়। অভিশপ্ত প্রতিবন্ধী নয়, পরিবার বা সমাজের বোঝা নয়- প্রকৃত মানুষ হতে চায় এই তামান্না নূরা। সে পা দিয়ে শুধু লেখে না চামচ দিয়ে খেতেও পারে। মুঠোফোন ব্যবহার করতে পারে। যেন একটি পা-ই দুই হাতের যোগান দেয়। তামান্না নূরার মা খাদিজা খাতুন শিল্পী বলেন, জন্ম থেকেই ওর দুটি হাত ও একটি পা নেই। কিন্তু তামান্না সব কাজ নিজে করতে পারে। পা দিয়ে খাওয়া-দাওয়া, সাজগোজ করা, চুল আঁচড়ানো, বইয়ের পাতা উল্টানো, ছবি আঁকা, খাতায় দাগ কাটা, লেখার কাজ সবই করতে পারে। পা দিয়ে করাটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। মা খাদিজা খাতুন শিল্পী আরও বলেন, তাদের মেয়ে প্রতিবন্ধী হলেও তাদের কাছে বোঝা নয় বরং তাকে নিয়ে তারা রীতিমতো স্বপ্ন দেখেন।

প্রতিদিন তামান্না নূরাকে হুইল চেয়ারে বসিয়ে যখন স্কুলে পৌঁছাতে যান তখন অনেকেই তাকে মেধাবী মা বলে সম্বোধন করেন। যা শুনে তিনি গর্ববোধ করেন। জোনাব আলী খান মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হেলাল উদ্দিন খান জানান, তামান্না নূরা অদম্য মেধাবী। সে কখনো কারও কাছে প্রাইভেট বা টিউশনি না পড়েও ক্লাসে প্রথম। প্রধান শিক্ষক হেলাল উদ্দিন খান আরও বলেন, তামান্না মুখ ও পা ব্যবহার করে জ্যামিতির চিত্র আঁকার পাশাপাশি সে খুব ভালো ভালো ছবিও আঁকতে পারে। একটি পা দিয়ে আর মেধাকে কাজে খাটিয়ে সে অনেক পথ পাড়ি দিতে চায়। তামান্না বড় হয়ে ডাক্তার হতে চায়। তিনি তার ব্যবহারেরও প্রশংসা করেন। অদম্য তামান্না এক পায়ে এগিয়ে চলছে স্বপ্নের পথে।

Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on Twitter0Share on LinkedIn0Share on Reddit0

Tags: , , , , ,



Daily Bastobota | bangla news
সম্পাদক : মোঃ জান্নাতুল বাকি
প্রকাশক : আব্দুল মান্নান তালুকদার
মোক্তার বার ভবন (২য় তলা), নিউ মার্কেট রোড, বাগেরহাট।
টেলিফোন : ০৪৬৮-৬৪৭১১
ই-মেইল: dbastobota@gmail.com