রসের সন্ধানে ব্যস্ত এখন কেশবপুরের গাছিরা

নভেম্বর ২৬, ২০১৮ : ৫:৫৫ অপরাহ্ণ || দৈনিক বাস্তবতা

print
কেশবপুর (যশোর) প্রতিনিধি : কেশবপুরে শীত মৌসুম আসলেই গাছিরা খেজুর রসের সন্ধানে গাছ তুলতে বা গাছ কাঁটতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। খেজুর রসের গুড় দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি হয় বলে গাছিরা জানান। গাছিরা প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত গাছ কাঁটার কাজ নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করেন। এদিকে মিনি ইটভাঁটায় খেজুর গাছ পুড়ানোর কারণে রস ও গুড় এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। ভাল্লুকঘর, মূলগ্রাম, বেলকাটি, সাগড়দাড়ি, ফতেপুর, চিংড়া, হাসানপুর, ধর্মপুর, আওয়ালগাতি, ভান্ডারখোলা, দেউলি, বাগদাহ, সাবদিয়া, মজিদপুর, মধ্যকুল, ব্রহ্মকাটি, রামচন্দ্রপুর, ব্যাসডাঙ্গা, পাঁজিয়া, গড়ভাঙ্গা, কলাগাছি, গৌরিঘোনা, ভেরচি, মাগুরখালি, মঙ্গলকোট, বড়েঙ্গা, কন্দর্পপুর, পাথরা, কেদারপুরসহ অনেক গ্রামে ঘুরে দেখা গেছে গাছিরা খেজুরের রস সংগ্রহের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ যেমন ঠিলে-খুংগি-দড়া-গাছি দাঁ বালিধরাসহ ইত্যাদি নিয়ে গাছ কাঁটার কাজে ব্যস্ত রয়েছে।

শ্রমজীবি গাছিরা জানান, প্রতি বছরে খেজুর গাছ কর্তনের কারণে রস ও গুড়ের দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনেক গাছের মালিকরা খেজুর গাছ কর্তন করে মিনি ভাঁটায় বিক্রয় করে। যার ফলে খেজুরের রস ও গুড় বিলুপ্তির পথে। মজিদপুর গ্রামের শামছুর রহমান জানান, এবছরে প্রথম ১শ টাকা দিয়ে এক ভাড় রস কিনেছি। গত বছরে যার দাম ছিলো ৭০/৮০ টাকা। রামচন্দ্রপুর গ্রামের ভ্যানচালক শাহাবুদ্দিন জানান, আমি গরিব মানুষ হওয়ায় ২ বছর ধরে রস কিনে খেতে পারছি না। এর আগে প্রতি বছরে প্রায় ১০/১২ ভাড় রস কিনতাম। তখন প্রতি ভাড় রসের দাম ছিলো ১৫/২০ টাকা। খেজুর গাছ কর্তনের কারণে রসের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। মধ্যকুল গ্রামের শাহিনুর রহমান জানান, গত বছর আমার এলাকায় জলাবদ্ধতা থাকার কারণে অনেক খেজুর গাছ মারা গেছে।

এবছর জলাবদ্ধতা না থাকায় আমার এলাকায় রস পাওয়া গেলেও দাম অনেক চড়া। খেজুর গাছের মালিকরা জানান, একজন শ্রমিককে প্রায় ২/৩শ টাকা করে দেয়া হয়। যার জন্য রসের দাম বৃদ্ধি হয়েছে। এর আগে প্রতিটি গাছে ১ থেকে দেড় ভাড় রস হতো, এখন এর অর্ধেক হচ্ছে। চিরায়ত বাংলার প্রতিটি মানুষের মুখে-মুখে ধ্বনিত হয় শীতের আগমনে। আবহমান বাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েদেরও ব্যস্ততা বেড়ে যায় দ্বিগুন। মৌসুমের শুরুতে আলতো শীতের সোনালী সূর্যের রোদেলা সকালে গাছিরা বাঁশের ডগা দিয়ে নলি তৈরীতে ব্যস্ত সময় পার করে। কেউবা আবার পাটের আশ দিয়ে দড়া তৈরীতে মগ্ন। বেলা বাড়তেই ঠিলে-খুংগি-দড়া-গাছি দাঁ বালিধরা নিয়ে গাছিরা ছুটে চলে গাছ কাটতে। আবার ভোরে উঠে রস নামাতে কূয়াশা ভেদ করে চড়ে বেড়ায় এক গাছ থেকে আরেক গাছে। এরপর ব্যস্ততা বাড়ে মেয়েদের সকাল থেকে দুপুর অবধি কোন ফুসরত নেই দম ফেলার। এ্যালমুনিয়ামের কড়াইতে রস জালিয়ে গুড় তৈরী করতে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত সময় লাগে।

জিরেন রস দিয়ে দানাগুড়, ছিন্নি গুলা, পাটালী তৈরী হয়। ঘোলা রস দিয়ে তৈরী হয় ঝুলা গুড়। নলেন রসের পাটালী খেতে খুব সুস্বাদু হয় বলে বাজারে এর কদর অনেক বেশী। কেশবপুরের খেজুরের রসের খ্যাতি বাংলাদেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। কেশবপুর, মনিরামপুর থেকে তাজা খেজুরের রসের তৈরী গুড় বাংলাদেশের প্রত্যেক অঞ্চলের চাহিদা মিটিয়ে থাকে। পাশাপাশি আমাদের পার্শবর্তী দেশ ভারত, মায়ানমারসহ পৃথিবীর কয়েকটি দেশে কেশবপুরের খেজুরের গুড়ের ব্যাপক কদর রয়েছে। কেশবপুর তথা যশোরকে সারা পৃথিবীতে পরিচিত করেছে যে কয়টি বিষয় তার মধ্যে যশোরের কেশবপুরের খেজুরের রস অন্যতম একটি। কেশবপুরের খেজুরের রসের গুড় বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। শীত আসলেই আবহমান বাংলার ঘরে ঘরে শুরু হয় উৎসবের আমেজ। প্রতি ঘরে ঘরে শুরু হয় পিঠা তৈরীর জন্য ঢেঁকিতে চাউলের গুড়া তৈরীর মহোৎসব। বাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে সন্ধা হলেই একদিকে শুরু হয় কবি গান অন্যদিকে সন্ধে রস দিয়ে শুরু হয় বিভিন্ন প্রকার পিঠা পুলিসহ পায়েশ তৈরীর ধুম।

Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on Twitter0Share on LinkedIn0Share on Reddit0



Daily Bastobota | bangla news
সম্পাদক : মোঃ জান্নাতুল বাকি
প্রকাশক : আব্দুল মান্নান তালুকদার
মোক্তার বার ভবন (২য় তলা), নিউ মার্কেট রোড, বাগেরহাট।
টেলিফোন : ০৪৬৮-৬৪৭১১
ই-মেইল: dbastobota@gmail.com